July 16, 2026, 10:25 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
চ্যাম্পিয়নরা শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কখনো হার মানে না—এই পুরোনো সত্যটিই যেন আরও একবার প্রমাণ করল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ সাত মিনিটে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে রুদ্ধশ্বাস এই জয়ের মাধ্যমে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
প্রথমার্ধে দুই দলই ছিল কৌশলী ও সতর্ক। বলের দখলে এগিয়ে থাকলেও আর্জেন্টিনা খুব বেশি পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। অন্যদিকে ইংল্যান্ডও রক্ষণ সামলে দ্রুত পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা চালায়। বিরতির পর ৫৫তম মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। গোল হজমের পর থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেয় আর্জেন্টিনা। একের পর এক আক্রমণে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে চাপে ফেলে তারা।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর সেই চাপের ফল আসে ৮৫তম মিনিটে। লিওনেল মেসির দারুণ পাস থেকে এনজো ফার্নান্দেজ জোরালো শটে সমতা ফেরান। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে, তখনই আসে চূড়ান্ত নাটক। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আবারও মেসির নিখুঁত পাস থেকে লাউতারো মার্তিনেজ জয়ের গোলটি করেন। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ে আকাশি-সাদা সমর্থকরা।
এই জয় কেবল একটি নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প নয়; এটি আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সাফল্যের আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায়। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে স্কালোনির দল সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ, সংগঠিত এবং আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছে। আক্রমণ, মাঝমাঠ ও রক্ষণ—তিন বিভাগেই তারা দেখিয়েছে অসাধারণ সমন্বয়। বলের নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত পাস আদান-প্রদান, প্রতিপক্ষের দুর্বল জায়গায় আঘাত হানা এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে দৃঢ় রক্ষণ—সব মিলিয়ে আধুনিক ফুটবলের প্রায় নিখুঁত এক প্রদর্শনী উপহার দিয়েছে তারা।
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দলগত ফুটবল। একক নৈপুণ্যের চেয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করেই তারা আজ বিশ্বের অন্যতম সফল দলে পরিণত হয়েছে। অভিজ্ঞদের সঙ্গে তরুণদের দুর্দান্ত সমন্বয়, কৌশলগত নমনীয়তা এবং ম্যাচভেদে পরিকল্পনা বদলে ফেলার দক্ষতা প্রতিটি ম্যাচেই তাদের এগিয়ে রেখেছে।
৩৯ বছর বয়সেও লিওনেল মেসি দলের প্রাণভোমরা। সেমিফাইনালে গোল না পেলেও দুটি আক্রমণ গড়ে দিয়ে জয়ের নেপথ্য নায়ক ছিলেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতা, মাঠে নেতৃত্ব এবং সৃজনশীলতা এখনও আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। একই সঙ্গে এনজো ফার্নান্দেজ, লাউতারো মার্তিনেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ও এমিলিয়ানো মার্তিনেজদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দলটিকে আরও পরিণত ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছে।
এই সাফল্যের আরেকটি বড় ভিত্তি কোচ লিওনেল স্কালোনির পরিকল্পনা। প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে ম্যাচভিত্তিক কৌশল নির্ধারণ, সঠিক সময়ে পরিবর্তন আনা এবং পুরো স্কোয়াডকে সমানভাবে প্রস্তুত রাখার সুফল পেয়েছে আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনালেও শেষ মুহূর্তের আক্রমণাত্মক পরিবর্তন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং কয়েক বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি সুসংগঠিত দলের স্বাভাবিক পরিণতি। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ধারাবাহিক সাফল্যের পর আর্জেন্টিনা আবারও প্রমাণ করল, বড় দলকে বড় করে তোলে শুধু তারকা খেলোয়াড় নয়—দলগত শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার অদম্য বিশ্বাস।
এখন আর্জেন্টিনার সামনে আর মাত্র একটি বাধা। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন। আর মাত্র একটি জয় পেলেই টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের বিরল কীর্তি গড়বে স্কালোনির দল। বর্তমান ফর্ম, আত্মবিশ্বাস এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় ফুটবলবিশ্বের দৃষ্টি এখন আকাশি-সাদা জার্সিধারীদের দিকেই।